Ticker

6/recent/ticker-posts

মারজ ই দাবিক যুদ্ধ | মারজ-ই-দাবিক যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল

প্রশ্নঃ মারজ-ই-দাবিক যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা করো?বা মারজ-ই- দাবিক যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর?

মিসরে মামলুকদের ইতিহাসে 'মারজ-ই-দাবিকের যুদ্ধ' এক যুগান্তকারী ঘটনা ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ শে অগাস্ট সিরিয়ার আলেপ্পোর নিকটবর্তী “মারজ-ই-দাবিকের প্রান্তরে” মামলুক সুলতান কনসো আল ঘোরীর সঙ্গে তুর্কি সুলতান প্রথম সেলিমের এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটাই ইতিহাসে 'মারজ-ই-দাবিকের যুদ্ধ' হিসেবে পরিচিত। এ যুদ্ধে মামলুক সুলতান পরাজিত হলে তুর্কি সুলতান সেলিম সহজেই সিরিয়া ও মিসর তুর্কি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। এর ফলে মিসরে মামলুক শাসনের চির অবসান সূচিত হয় এবং মিসর তুর্কি সাম্রাজ্যের অধীনে একটি প্রদেশে রূপান্তরিত হয়। এই যুদ্ধ ছিল একটি চূড়ান্ত মিমাংসকারী যুদ্ধ। ইতিহাসে যে কয়েকটি যুদ্ধ ইতিহাসের ধারাকে পরিবর্তিত করেছিল নিঃসন্দেহে "মারজ-ই-দাবিদের যুদ্ধ" এদের মধ্যে অন্যতম ছিল।



মারাজ-ই-দাবিকের যুদ্ধের কারণসমূহ

এই যুদ্ধের পেছনে বহু কারণ ছিল। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো :

১. পূর্ব শত্রুতা

মিসরের মামলুকদের সাথে তুর্কিদের আগে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় বায়েজীদের সময়ে মামলুকগণ এশিয়া মাইনরের তিনটি দুর্গ দখল করে নেয়। এতে করে তুর্কি সুলতানদের সাথে মামলুকদের শত্রুতার সূচনা হয়। সেলিম সিংহাসনে আরোহণ করে ঐ সমস্ত দুর্গগুলো পুনরুদ্ধার ও মামলুক রাজ্য জয় করবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন।

২. সীমান্ত সুরক্ষা

পারশ্যের সাথে সুলতান সেলিম যুদ্ধে লিপ্ত হলে মামলুক সুলতান সিরিয়া সীমান্তে দুর্গ নির্মাণ ও সৈন্য সমাবেশ করে। এছাড়া মামলুক সুলতানের করদ রাজ্যগুলো তুর্কি সুলতান সেলিম কর্তৃক আক্রান্ত হলে মামলুক সুলতান সিরিয়ার সীমান্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন।

৩. সেলিমের উচ্চাভিলাষী নীতি

তুর্কি সুলতান সেলিম ছিলেন একজন উচ্চাভিলাষী শাসনকর্তা। স্বভাবতই তিনি চেয়েছিলেন মিসর বিজয় করতে। তাই মামলুক সুলতানের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি মিসর জয়ে প্রলুব্ধ হন।

৪. মক্কা ও মদীনার কর্তৃত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা

মিসরের সুলতানগণ পবিত্র মক্কা ও মদীনা শহরের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। কিন্তু তুর্কি সুলতান সেলিম এ দুটি শহর নিজ অধিকারে নিয়ে এসে মুসলিম জাহানের একচ্ছত্র অধিপতি হতে চেয়েছিলেন।

৫. মামলুক সুলতান ঘুরীর কূটনীতি

তুর্কি সুলতান সেলিমের কাছে পরাজিত হয়ে পারশ্যের সাফাভী বংশের সুলতান

শাহ ইসমাইল ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য মামলুক সুলতানের সাহায্য প্রার্থনা করেন। এতে মামলুক সুলতান ঘোরী তুর্কি সুলতানের সাথে শাই ইসমাঈলের মিত্রতা স্থাপনের জন্য একটি মিশন গঠন করেন। তার কার্যকলাপ সন্দেহমুক্ত করবার জন্য তিনি আব্বাসীয় খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলসহ সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ

কর্মচারী ও বিচারকমণ্ডলীকে এ মিশনে অন্তর্ভুক্ত করেন। এটি আসলে মামলুক সুলতানের ছলনা ছিল মাত্র। শাহ ইসমাঈলকে সাহায্য করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। গুপ্তচরের মাধ্যমে তুর্কি সুলতান এ খবর জানতে পেয়ে খুবই অসন্তুষ্ট

৬. শান্তি মিশনের ব্যর্থতা

তুর্কি সুলতান গুপ্তচরের মাধ্যমে আগেই মামলুক সুলতানের চক্রান্তের কথা জানতে পারেন। সুতরাং, মামলুক সুলতানের শান্তি মিশন তার কাছে এসে

পৌঁছলে তিনি এর প্রতি কোনো গুরুত্ব প্রদান করেননি। বরং তিনি এই শান্তি মিশনের সদস্যদের দেহ থেকে মাথা ফেলে দিয়ে মামলুক সুলতানের কাছে পাঠিয়ে দেন।

৭. দূতের অপমাণ

তুর্কি সুলতানের এহেন আচরনে মামলুক সুলতান নিজেকে খুবই অপমানিত মনে করেন। এর ফলে তিনি তুর্কি সুলতানের দূতকে খুবই অপমানিত করেন এবং বন্দি করে রাখেন।

৮. সন্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

মামলুক সুলতানের এ-রকম কাজে তুর্কি সুলতান খুবই অসন্তুষ্ট হন এবং মামলুকদেরকে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য একটি শক্তিশালী তুর্কিবাহিনী নিয়ে আলেঙ্গোর দিকে যাত্রা করেন। এবার মামলুক সুলতান নিজের বিপদ উপলব্ধি করে তুর্কি সুলতানের কাছে সন্ধির প্রস্তাব করেন। কিন্তু সেলিম তা প্রত্যাখ্যান করে।যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন।

যুদ্ধের ঘটনাবলি

শেষে উভয়ের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্ট আলেপ্পোর নিকটবর্তী "মারজ-ই-দাবিকের যুদ্ধে উভয়ে মুখোমুখি হয়। তুর্কিবাহিনীর তুলনায় মামলুকবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা কম ছিল। এছাড়া

মামলুকবাহিনীর কোনো গোলন্দাজ বা বন্দুকধারী সৈন্য ছিল না। আবার মামলুকবাহিনীর একাংশ বিশ্বাসঘাতকতা করে তুর্কিবাহিনীর সাথে যোগদান

করে । তুর্কিবাহিনীর কামানের গোলার আঘাতে মামলুকবাহিনী বিধ্বস্ত হয়। ৭৫ বছরের বৃদ্ধ মামলুক সুলতান ঘোরী অসীম সাহসীকতার সাথে যুদ্ধ করে। পরাজিত ও নিহত হন। কথিত আছে যে, মামলুক সুলতান মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে যান এবং এক তুর্কি সৈন্য মামলুক সুলতানের মাথা দ্বিখণ্ডিত করে তুর্কি সুলতান সেলিমের কাছে পাঠিয়ে দেন।

ফলাফল

এ যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো :

১. মামলুক সাম্রাজ্যের পতন

কানসোহ আল ঘোরীর পর তার ক্রীতদাস ও পোষ্যপুত্র ভূমানবে সিংহাসনে আরোহণ করে তুর্কিবাহিনীর মোকাবেলা করে পরাজিত হন। এর ফলে ২৬৭ বছরব্যাপী (১২৫০-১৫১৭ খ্রি.) মামলুক সালতানাতের অবসান ঘটে।

২. সেলিমের মক্কা ও মদীনার কর্তৃত্ব লাভ

এই যুদ্ধে জয়ের ফলে মক্কা ও মদীনার কর্তৃত্ব সেলিমের ওপর এসে পড়ে। জুমআর খুৎবায় সেলিমের নাম উচ্চারিত হলো।

৩. খিলাফতের পরিবর্তন

এই যুদ্ধের ফলে মিসরবাসী একইসঙ্গে তাদের সুলতান ও খলিফাকে হারায়। কারণ আব্বাসীয় খলিফাকে সেলিম বন্দি করে কনস্টান্টিনোপলে নিয়ে যান এবং তার কাছ থেকে খলিফার পদবী কেড়ে নেন। এতে করে খিলাফতের গতি মিসর হতে তুরস্কে স্থানান্তরিত হয়।)


৪. কায়রোর মর্যাদাহানী

এই যুদ্ধের ফলে ইসলামের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র কায়রোর মর্যাদাহানী ঘটে । কারণ তা তুরস্কের একটি প্রাদেশিক শহরে পরিণত হয়।

৫. উন্নত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন

বিজিত প্রজাদের মঙ্গলের জন্য সেলিম উন্নত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিদানস্বরূপ খায়ের বে ও জানবেরদীর ওপর যথাক্রমে সিরিয়া ও মিসরের শাসনভার অর্পিত হলো। তাদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও সাহায্যের

জন্য ২৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিষদ গঠিত হয়।

৬. তুর্কিদের প্রাধান্য বৃদ্ধি

এই যুদ্ধের ফলে মুসলিম বিশ্বে তুর্কিদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত মারজ-ই-দাবিকের যুদ্ধ একদিকে যেমন মিসর ও সিরিয়াতে মামলুক রাজত্বের পতন ডেকে আন্দে আবার অন্যদিকে ঐসব অঞ্চলে মামলুকদের

পরিবর্তে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটা পরবর্তীকালের ইতিহাসের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এই যুগান্তকারী যুদ্ধ মুসলিম জাহানের খিলাফতের ভাগ্যকেও পরিবর্তন করে দেয়। এর ফলে মিসরের আব্বাসীয় খিলাফতের চির অবসান ঘটে এবং কনস্টান্টিনোপলে তুর্কি খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। এই যুদ্ধে তুর্কি সুলতান সেলিমকে মুসলিম বিশ্বের পোপ বা ধর্ম গুরুর

আসনে অধিষ্ঠিত করে। মুসলমানদের ইতিহাসে যে কয়েকটি যুদ্ধ ইতিহাসের ধারাকে পরিবর্তিত করে ছিল নিঃসন্দেহে মারজ-ই-দাবীকের যুদ্ধ এদের মধ্যে অন্যতম ছিল। কাজেই বলা যায় যে, এ যুদ্ধ মিসরের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে দেয়।


১. মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস' কে, আলী, ঢাকা-২০০১।

২. মধ্য প্রাচ্যের ইতিহাস' কে. আলী, ঢাকা-২০০১, প্রাগুক্ত।

৩. মধ্য প্রাচ্যের ইতিহাস - পূর্বোক্ত 


Post a Comment

0 Comments